সকাল নারায়ণগঞ্জঃ
নারায়ণগঞ্জের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মর্গ্যান গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ-এর সহকারী প্রধান শিক্ষক লায়লা আক্তার দীর্ঘ ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা মানসিক নির্যাতন, সামাজিক অপমান ও প্রশাসনিক অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে নিজ কর্মস্থলে ফিরেছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে তিনি বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তার প্রত্যাবর্তন শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়—এটি শিক্ষাঙ্গনে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়, লায়লা আক্তারকে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল। নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে প্রেরিত চিঠি ও তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হয়।
সরকারি অনুসন্ধানে দেখা যায়, তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ বা ভিত্তি পাওয়া যায়নি। বরং ঘটনাপ্রবাহে প্রতীয়মান হয়েছে যে, পরিকল্পিতভাবে তাকে অপসারণের চেষ্টা করা হয়েছিল।
এমতাবস্থায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)-এর মহাপরিচালককে অবিলম্বে তাকে পূর্বের পদ অর্থাৎ সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে বহাল রাখার নির্দেশ দেয়।
বিদ্যালয়ে ফিরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন লায়লা আক্তার। তিনি জানান, গত ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পর একটি স্বার্থান্বেষী মহল পরিকল্পিতভাবে মব সৃষ্টি করে তার ওপর চড়াও হয়।
তার ভাষায়—
“আমাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা হয়। সন্তানদের মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। ভয় দেখিয়ে জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানো হয়। আমি তখন নিজের ও সন্তানের নিরাপত্তার কথা ভেবে বাধ্য হই।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, শুধু পদত্যাগেই থেমে থাকেনি ঘটনাটি। বিদ্যালয়ের কোয়ার্টার থেকে তাকে কার্যত এক কাপড়ে বের করে দেওয়া হয়। ব্যক্তিগত জিনিসপত্র নেওয়ারও সুযোগ পাননি তিনি।
ঘটনার পর থেকেই তিনি বিভিন্ন প্রশাসনিক দপ্তরে আবেদন জানান। জেলা প্রশাসন, শিক্ষা অধিদপ্তর এবং মন্ত্রণালয়ের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। একাধিক দফায় তদন্ত, নথিপত্র যাচাই এবং সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে পুরো বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হয়।
দীর্ঘ অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক চাপের মধ্যেও তিনি তার অবস্থানে অটল ছিলেন। অবশেষে সরকারি তদন্তে তার নির্দোষিতা প্রমাণিত হওয়ায় পুনর্বহালের পথ সুগম হয়।
লায়লা আক্তার দাবি করেন, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনিয়ম, প্রশাসনিক অসংগতি ও শৃঙ্খলাভঙ্গের বিরুদ্ধে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার ছিলেন। সততা ও স্বচ্ছতার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণেই একটি চক্র তার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ছিল।
তিনি বলেন—
“আমি সবসময় প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে কাজ করেছি। অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলেছি। সেই কারণেই আমাকে সরানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে এই পরিস্থিতি তৈরি করা হয়।”
তার এই বক্তব্য শিক্ষাঙ্গনে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—একজন শিক্ষক যদি অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন, তবে কি তাকে এভাবেই চাপে ফেলা হবে?
লায়লা আক্তারের পুনর্বহালের খবরে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের একাংশ সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। অনেকেই মনে করছেন, সত্য উদঘাটনের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
কয়েকজন অভিভাবক জানান, তিনি একজন দক্ষ ও দায়িত্বশীল শিক্ষক। তার অনুপস্থিতিতে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছিল। এখন আবার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরবে বলে তারা আশা করছেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃঢ় সিদ্ধান্তকে অনেকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, এই ঘটনা ভবিষ্যতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষককে জোরপূর্বক হেনস্তা বা অপসারণের ক্ষেত্রে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
লায়লা আক্তার শিক্ষা মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন—
“আমি ন্যায়বিচার পেয়েছি। যারা সত্য উদঘাটনে সহযোগিতা করেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। আমি আবারও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে চাই।”
লায়লা আক্তারের স্বপদে ফেরা কেবল ব্যক্তিগত পুনর্বহাল নয়—এটি শিক্ষাঙ্গনে ন্যায়, স্বচ্ছতা ও আইনের শাসনের প্রতিফলন।
নারায়ণগঞ্জের শিক্ষা অঙ্গনে আলোচিত এই ঘটনাটি এখন এক নতুন বার্তা দিচ্ছে—
অন্যায় যত শক্তিশালী হোক, সত্য শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হয়ই।