বিলাসের বিকাশ বিড়ম্বনা, নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের সফলতা

সকাল নারায়ণগঞ্জঃ

স্টাফ রিপোর্টার (আশিক)

আজ বিলাসের (ছদ্দ নাম) মন খারাপ। অনেক শখের কম্পিউটারটি বিক্রি করে দিয়েছে পানির দামে। এ কম্পিউটার কিনতে বাবার নিকট কত যে কাঁদতে হয়েছে তার ইয়াত্তা নেই।

মা শতাধিক ধমক খেয়েছে বাবার নিকট থেকে। বাবা সামান্য শ্রমজীবি। তারপরও অনেক কষ্টে কিনে দিয়েছিলেন কম্পিউটারটি।

তখন থেকেই বিলাসের স্বপ্ন কম্পিউটার ঘিরে। স্কুলের টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে ইন্টারনেট বিল দেয়। মনের মাঝে কত স্বপ্ন আঁকা হয়ে যায় ভবিষ্যত নিয়ে।

কিন্তু আজ সেই কম্পিউটার বিক্রি করে পৃথিবীর সব সুখ স্বপ্ন বিষর্জন দিয়েছে বিলাস। রাতে মা একবার ডেকে গিয়েছে খাবার খেতে।

কিন্তু ক্ষুদা নেই তার। মা বুঝতে পারে কিছু একটা হয়েছে। কিন্তু এটা জানেনা বিলাস তার জীবন থেকে কম্পিউটার হারিয়েছে। গল্পটা অন্যরকম।

দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ে বিলাস। করোনার কারণে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম শ্রমজীবি বাবাও বেকার। বাসায় এক বেলা রান্না হয় কোনরকম। তিন ভাই বোনের সংসার কোনমতে চলে।

কতদিন আর বেকার বসে থাকা যায়। বাজারে একটি বিকাশ ও মোবাইল রিচার্জের দোকানে পার্ট টাইম চাকুরি নেয় বিলাস। নামে বিলাস হলেও তার জীবনে কোন বিলাসিতা নেই। সারাদিন দোকানে বসে বসে কাস্টমারদের সেবা দেয়। মাস শেষে সামান্য যা বেতন পায় তা দিয়ে সংসারে কিছুটা হাল ধরে।

বিকাশের কারণে পরিচয় হয় এক মহিলা কাস্টমারের সাথে। মহিলার স্বামী বিদেশে থাকেন। বিদেশ থেকে বিকাশের মাধ্যমে টাকা লেনদেন করেন। তবে সেই মহিলা নিজে বিকাশের ব্যবহার জানেন না। টাকা লেনদেন করতে হলে চলে আসেন বিলাসের কাছে।

খুব কম সময়ে সঠিকভাবে টাকা লেনদেন সম্পন্ন করে দেয় সে। বিশ্বাসটা বেড়ে যায় মহিলার। যে কারণে ধন্যবাদ দেয়ার পাশাপাশি সময়ে অসময়ে বিলাসকে অতিরিক্ত কিছু টাকাও দেন তিনি। সেদিনও মহিলাটি এসেছিলেন বিলাসের নিকট।

উদ্দেশ্য ২৫ হাজার টাকা নিজের বিকাশ একাউন্ট থেকে অন্য এক ব্যক্তির একাউন্টে পাঠানো। মহিলা যে মোবাইলটি ব্যবহার করেন সেটির ডিসপ্লের গ্লাস ছিল ভাঙ্গা।

আর সেটিতেই বিকাশ একাউন্ট নম্বরটি তুলে এনেছিলেন মহিলা। সেই নম্বর দেখে টাকা পাঠাতে গিয়ে ভুলে একটি ডিজিট পরিবর্তন হয়ে টাকা চলে যায় অন্য একটি একাউন্টে। ভুল সেতো ভুলই। সামান্য অসাবধানতায় এমন ভুলে দিশেহারা বিলাস।

দ্রুত ফোন দেন যার নম্বরে ভুলে চলে গেছে টাকা। ফোন রিসিভ করে বিষয়টি জানতে পেরে মোবাইলটি বন্ধ করে দেন সেই ব্যক্তি। এবার আর কোন পথ খোলা নেই বিলাসের জন্য।

এমন ভেবে চোখের জ্বলে ভাসে। কিন্তু মহিলা কোন প্রকার অনুকম্পা দেখায়নি তাকে। এখনই তার টাকা চাই। অনেক অনুনয় বিনয় করেও কোন ফল হয়নি।

আর তাইতো শখের কম্পিউটার বিক্রি ও ধার দেনা করে মহিলার টাকা পরিশোধ করে পাঠিয়ে দেয় কাঙ্খিত বিকাশ নম্বরে। মহিলার টাকা দিলেও মন থেকে দুঃখ যায়নি বিলাসের। রাতেই একটি ম্যাসেজ দিয়ে সাহায্য চায় জেলা পুলিশের ফেসবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে।

রিপ্লাই পেয়ে জানায় তার বিকাশ বিড়ম্বনার গল্প। তাৎক্ষণিকভাবে বিকাশ কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে জেলা পুলিশের আইসিটি শাখা।

বিকাশ কর্তৃপক্ষ দ্রুত সাড়া দিয়ে জানায় ভুলে যাওয়া বিকাশ একাউন্ট থেকে টাকা সরানো হয়েছে অন্য একটি একাউন্টে। এরপর শুরু হয় দাপ্তরিক চিঠি আদান প্রদান। কিন্তু এর জন্য যার একাউন্ট থেকে টাকাটি ভুলে গিয়েছে তাকে একটি জিডি করতে হবে থানায়। জানানো হয় বিলাসকে।

অনেক অনুনয় বিনয় করেও মহিলাকে রাজী করাতে পারেনি সে। সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের সহযোগিতায় জিডি সম্পন্ন হয়। সেটি পাঠানো হয় বিকাশ অফিসে। এরপর একটি আবেদন করতে হয় মহিলাকে। সেটিও পুলিশের সহযোগিতায় করা হয়।

বিকাশ কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী সকল কার্যক্রম সম্পন্ন করে জানায় আইসিটি-কে। এবার টাকা ফেরৎ নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী সরকারি স্ট্যাম্পে একটি চুক্তিনামায় স্বাক্ষর করতে হবে মহিলাকে। এখানেও মহিলার চরম আপত্তি।

বারবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় বিলাস। অতপঃর পুলিশের সহযোগিতায় প্রায় দুই সপ্তাহ পর মহিলাকে রাজী করানো হয়। বিকাশ কর্তৃপক্ষের চুক্তিনামায় স্বাক্ষর করেন তিনি। অবশেষে সকল কার্যক্রম শেষে বিকাশ কর্তৃপক্ষ ভুলে যাওয়া ২৫ হাজার টাকা ফেরৎ দেয় মহিলার একাউন্টে।

মহিলা এবার টাকাটা পেয়ে ফেরৎ দেন বিলাসকে। টাকা ফেরৎ পেলেও কম্পিউটার ফেরৎ পায়নি বিলাস। ফেরৎ পায়নি এতদিনে তার চোখ থেকে ঝরে যাওয়া জ্বলও। সেটা নিয়েও বিলাসের নেই কোন বিলাপ।

নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের আইসিটি শাখার এমন সহযোগিতা পেয়ে যারপর নেই খুশি সে। এমন সব বিলাসের বিকাশ বিড়ম্বনার গল্পও কম নয়। কিন্তু বিলাসের গল্পটা অন্য সব গল্প থেকে একটু ভিন্ন।

তাইতো বিলাস চোখের জ্বলে মিশিয়ে বলেছে এমন ঘটনা যেন আর কারো না ঘটে তার জন্য গল্পটা সবাইকে যেন জানানো হয়। সাথে এটাও বলেন তার এবং মহিলার নাম পরিচয় যেন গোপন থাকে।

গল্পের এমন পরিসমাপ্তিতে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ তথা আইসিটি শাখাও গর্বিত। আবারও প্রমাণ হলো সর্বদা জনগণের পাশে জেলা পুলিশ, নারায়ণগঞ্জ।