সবার প্রতি দয়াপরবশ আচরণে ইসলামী শিক্ষা

সকাল নারায়ণগঞ্জ অনলাইন ডেস্কঃ

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষকে অত্যন্ত ভালোবাসেন। তাই তো তিনি মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। 

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার প্রতি ভালোবাসার শিক্ষাই ইসলাম দিয়ে থাকে। এছাড়া আমরা একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ থাকব- এটাই আল্লাহপাকের ইচ্ছে। 

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ ইরশাদ করেছেন: ‘আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন এবং তারা আল্লাহকে ভালোবাসে’ (সুরা আল-মায়িদা, আয়াত: ৫৪)। 

আবার আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন: ‘আর তিনি (আল্লাহ) তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন’ (সুরা আর-রুম, আয়াত: ২১)। 

আল্লাহতাআলা আমাদের শ্রেষ্ঠ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন এজন্যই যে, আমরা যেন তার নির্দেশের ওপর আমল করি। এছাড়া আমাদের আল্লাহপাক সৃষ্টিই করেছেন তার ইবাদতের জন্য। অথচ আজ আমরা কী করছি? 

এমন কোনো অন্যায় কাজ নেই যা আমার মতো শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি দ্বারা সংঘটিত না হচ্ছে। আজ আমাদের মাঝে এমন অবস্থা বিরাজ করছে যে, আমারই সামনে বা আমার প্রতিবেশী কেউ না খেয়ে দিনাতিপাত করলেও তার প্রতি আমার হৃদয় থেকে সামান্যতম দয়া প্রদর্শনের বহি:প্রকাশ ঘটে না। 

হায়! আজ যেন বিবেকের মৃত্যু ঘটেছে। কত মন্দ কাজই না করছি, কাউকে হত্যা করতেও আমি দ্বিধাবোধ করছি না, জুলুম, অত্যাচার, নির্যাতন সবই আমার দ্বারা সংঘটিত হচ্ছে। 

আমি একবারের জন্যও ভেবে দেখেছি যে, এসব অন্যায়ের জন্য আমি আল্লাহপাকের কাছে যে জিজ্ঞাসিত হব? 

আসলে যারা সামাজিক পরিমণ্ডলে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে, রক্তপাত ঘটায়, ধ্বংসযজ্ঞ এবং নৈতিকতাবর্জিত ইসলামিক কর্মকাণ্ড চালায় তারা কখনও শান্তির ধর্ম ইসলামের অনুসারী হতে পারে না।

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে: হজরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সকল সৃষ্টি-প্রাণিকুল আল্লাহর পরিবার-পরিজন। 

অতএব আল্লাহতায়ালার কাছে তার সৃষ্টজীবের মাঝে সে-ই প্রিয়ভাজন যে তার অধীনস্ত ও সৃষ্টজীবের সাথে দয়াপরবশ আচরণ করে এবং তাদের প্রয়োজনের প্রতি যত্নবান থাকে’ (মিশকাত)।

অপর একটি বর্ণনা পাওয়া যায়, হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত: মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘একজন মুসলমানের কাছে অপর মুসলমানের ৬টি অধিকার প্রাপ্য। 

১. তার সাথে সাক্ষাত হলে ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলা। ২. সে হাঁচি দিলে ‘ইয়ারহাকুমুল্লাহ’ বলা। ৩. সে অসুস্থ হলে তার শুশ্রূষার জন্য যাওয়া। ৪. সে ডাকলে তার ডাকে সাড়া দেওয়া। ৫. সে মারা গেলে তার জানাজায় শামিল হওয়া। ৬. নিজের জন্য যা পছন্দ কর, অপরের জন্যও তা-ই পছন্দ করা। আর তার অবর্তমানে তার কল্যাণ কামনা করা’ (সুনান দারমি, কিতাবুল ইস্তিযান)।

অপর এক বর্ণনায় হজরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘একে অপরকে হিংসা করো না। একে অন্যের ক্ষতিসাধনের জন্য প্রতিযোগিতামূলকভাবে (পণ্যের) অলীক মূল্য বৃদ্ধি করো না। একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ রেখো না। 

একে অপরকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করো না অর্থাৎ সম্পর্কহীনতার ব্যবহার করো না। একজনের দাম-দর করার সময়ে অপরজন দাম করবে না। 

আল্লাহতাআলার বান্দা হিসেবে এবং পরস্পর ভাই-ভাই হয়ে থাক। মুসলমান ভাইয়ের প্রতি অন্যায় করতে পারে না। তাকে হীন জ্ঞান করতে পারে না, তাকে লজ্জিত করতে পারে না। 

তিনি (সা.) নিজ বুকের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, তাকওয়া হা হুন্না অর্থাৎ ‘তাকওয়া এখানে’। এ বাক্যটি তিনি তিনবার পুনরাবৃত্তি করেন। এরপর বলেন, নিজের কোনো মুসলমান ভাইকে অবজ্ঞা বা তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখাটাই কোনো মানুষের দুর্ভাগা সাব্যস্ত হওয়ার জন্য যথেষ্ট। 

প্রত্যেক মুসলমানের রক্ত, সম্পদ, সম্মান ও সম্ভ্রম অন্য মুসলমানের জন্য হারাম এবং সম্মানের যোগ্য’ (মুসলিম)।

আরেক বর্ণনায় রয়েছে: হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের জাগতিক কোনো অস্থিরতা ও কষ্ট লাঘব করেছে এবং যে ব্যক্তি কোনো অভাবগ্রস্তের সাহায্যের ব্যবস্থা করেছে এবং তার জন্য কোনো বিষয় সহজসাধ্য করেছে- আল্লাহতাআলা পরকালে তার জন্য স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা করবেন। 

যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দোষ-ত্রুটির গোপনীয়তা রক্ষা করে আল্লাহতাআলা পরকালে তার দুর্বলতাও ঢেকে রাখবেন। যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে আল্লাহতাআলা তার সাহায্যের জন্য প্রস্তুত থাকেন। 
যে ব্যক্তি জ্ঞানের অন্বেষায় বের হয় আল্লাহতাআলা তার জন্য জান্নাতের পথ সুগম করে দেন। যারা মসজিদের কোনো কোনায় বসে আল্লাহতাআলার কিতাব পাঠ করে এবং এর পঠন-পাঠনে লেগে থাকে- আল্লাহতাআলা তাদের জন্য সুখ ও প্রশান্তি অবতীর্ণ করেন, আল্লাহতাআলার রহমত তাদের আচ্ছাদিত করে রাখে। 

ফেরেশতারা তাদের নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ঘিরে রাখে। আল্লাহতাআলা তার নৈকট্যপ্রাপ্তদের কাছে তাদের কথা উল্লেখ করেন। যে ব্যক্তি আমলের ক্ষেত্রে শিথিলতা দেখায় তার বংশ ও পরিবার তার পুণ্যকর্মে গতি সঞ্চার করতে পারে না, অর্থাৎ বংশের জোরে কেউ জান্নাতে যেতে পারবে না’ (মুসলিম)। 

আমাদের ভাবতে হবে, যে বিষয়ে এত জোর তাকিদ প্রদান করা হয়েছে সে বিষয়ে আমরা কেন এত উদাসীন। তাই আসুন, আমরা একে অপরের প্রতি দয়াশীল হই। 

আমরা যদি এমনটি করি তাহলে আল্লাহতাআলাও আমাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করবেন। মহান আল্লাহতাআলা আমাদের সবাইকে প্রকৃত ইসলামের শিক্ষা অনুসরণ করে জীবন পরিচালনার তৌফিক দান করুন- আমিন।

 লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট